পাকিস্তানী সংস্কৃতির তাৎপর্য
লেখক: আবদুল হক
এ-দেশের সংস্কৃতি-আলোচনায় অনেক সময় শিথিলভাবে এ-রকম একটা ধারণা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় যে পাকিস্তানের সংস্কৃতি সর্বাত্মকভাবে ইসলামী বৈশিষ্ট্যেই বিশিষ্ট, এবং ভবিষ্যতে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে তাও হবে ইসলামী সংস্কৃতি। পাকিস্তানের সংস্কৃতি যে সর্বাত্মকভাবে ইসলামী সংস্কৃতি নয় তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না; কিন্তু ভবিষ্যতের সংস্কৃতি সর্বাত্মকভাবে ইসলামী সংস্কৃতি হবে কিনা, সেটা একটা প্রশ্ন। অনেকে বলেন, পাকিস্তানের সংস্কৃতি সর্বাত্মকভাবে ইসলামী সংস্কৃতিই হবে, কেননা পাকিস্তান একটা আদর্শভিত্তিক ‘রাষ্ট্র’ তার শাসন-সংবিধানেও সেই কথা বলা হয়েছে, এবং ইসলামী আদর্শ রূপায়ণের জন্যই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা।
এ-বিষয়ে বোধ হয়, দ্বিমতের অবকাশ নেই যে পাকিস্তানে ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশ সাধন মুসলমানদের একটা বিশেষ দায়িত্ব। এ-দায়িত্ব উপলব্ধির নির্ভুল প্রমাণ আমরা স্বাধীনতা লাভের পর যথেষ্টই পেয়েছি। ইসলাম আমাদের এবং সেই সঙ্গে বিশ্বমানবকে এমন কতকগুলি মৌলিক নীতি এবং মূল্যবোধ দিয়েছে যে জন্য আমরা সঙ্গতভাবে গর্ববোধ করতে পারি। সেইসব মৌলিক নীতি এবং মূল্যবোধ—যেমন তাওহিদ, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সাম্য, গণতন্ত্র, মানবতাবোধ, নারীর মর্যাদা—এ-দেশের মুসলিম সমাজ-জীবনে পূর্ণভাবে রূপায়িত হলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর হবে, এ-সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠতে পারে না; এবং এর প্রভাব অন্য সমাজের পক্ষে অকল্যাণজনক হবে তাও মনে হয় না, অন্ততঃ আমাদের মনে হয় না। পরাধীন আমলে কতকটা বাইরের অপ্রতিরোধ্য প্রভাবে, এবং কতকটা আমাদের নিজেদেরও দোষে ক্লাসিক্যাল ইসলামী সংস্কৃতি এবং ইসলামী মূল্যবোধগুলি থেকে আমরা অনেক দূরে সরে পড়েছি। সাহিত্য- দর্শন-বিজ্ঞান-ললিতকলার ক্ষেত্রে মুসলমানেরা একদিন উন্নতির সুউচ্চ শিখরে উন্নীত হয়েছিল, পশ্চিমী দেশগুলি আজ তার প্রশংসা করছে এবং তাদের কাছে ঋণ স্বীকার করেছে, অথচ আমরা অবনতির নিম্নতম স্তরে। এইসব চিন্তা-ভাবনা ইসলামী সংস্কৃতির জন্য মুসলমানদের মধ্যে একটা আবেগময় উদ্দীপনা এনে দিয়েছে। স্বাধীনতার যুগে, অনুকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ সাধন তাই মুসলমান তার একটা বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ইসলামী সংস্কৃতি এবং পাকিস্তানী সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ একার্থবোধক হতে হবে। এ-প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে পূর্ব-পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এ-প্রদেশের যাত্রা, কবি-গান, লোক-গাথা, লোকগীতি, হস্তশিল্প, নৃত্যকলা, নাট্যমঞ্চ, সাহিত্য এবং এমনি আরও অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এসেছে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের প্রায় একাধিপত্য রয়েছে, যেমন যাত্রায়, সাঁওতালী নৃত্যে, মনিপুরী নৃত্যে। এ-সব ক্ষেত্রে পূর্ব-পাকিস্তানের যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির অবদান অস্বীকার করা সম্ভব নয়, এবং ভবিষ্যতেও যে তাদের এইসব সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ চলবে না এবং তারা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবে না এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।
পূর্ব-পাকিস্তানের এই সংখ্যালঘু সংস্কৃতিকে আমরা ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে পারি না এবং এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির উপরও আমরা জোর করে ইসলামী সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে পারি না। আমরা তাদের বলতে পারি না, “আমরা যেমন ইসলামী সংস্কৃতি গড়ে তুলছি তেমনি আপনারাও ইসলামী সংস্কৃতি গড়ে তুলুন এবং আপনাদের এতদিনকার অনৈসলামিক সংস্কৃতি বর্জন করুন।” এই সাংস্কৃতিক জবরদস্তি যদি সম্ভব না হয় তবে পূর্ব-পাকিস্তানে এতদিন যেমন অনৈসলামিক সংস্কৃতি ছিল ভবিষ্যতেও তেমনি থাকবে, এবং ইসলামী সংস্কৃতি ও সংখ্যালঘু সংস্কৃতির যে সামগ্রিক যোগফল তাই হবে পূর্ব-পাকিস্তানের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির সামগ্রিক চেহারাটা পুরোপুরি ইসলামানুগ হবে না, তা বলাই বাহুল্য। রোমান্টিক কল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং যুক্তি ও বাস্তব-জ্ঞান বর্জন করা সব যুগের সব-দেশের মানুষেরই একটা বড় দুর্বলতা। একমাত্র এইরকম কল্পনার কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করলে তবেই ভুলে থাকা সম্ভব যে পূর্ব-পাকিস্তানের সংস্কৃতিতে এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে; এবং এই কারণে এ-প্রদেশের সংস্কৃতি পুরোপুরি ইসলামী সংস্কৃতি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আরও একটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments